রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১১:০২ অপরাহ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা ॥
ঈদের চেনা আনন্দ ও কোলাহল পেছনে ফেলে আবারও কর্মব্যস্ত জীবনের টানে রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছেন কর্মজীবী মানুষ। নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার চিরাচরিত সেই উৎসবের আমেজ কাটিয়ে রোববার (৩১ মে) রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেখা গেছে চিরচেনা সেই ব্যস্ত দৃশ্য। হাতে ব্যাগ, কাঁধে লাগেজ আর চোখে-মুখে কর্মস্থলে ফেরার তাড়া নিয়ে দলে দলে মানুষ নামছেন ট্রেন থেকে।
রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একের পর এক ট্রেন এসে পৌঁছায় কমলাপুর স্টেশনে। প্রতিটি ট্রেনেই ছিল চাকরিজীবী, শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার মানুষের উপচেপড়া ভিড়। তবে ঈদের আগে বাড়ি ফেরার পথে যে চরম ভোগান্তি আর ধকল পোহাতে হয়েছিল, ফিরতি যাত্রায় তার তুলনায় অনেকটাই স্বস্তি মিলেছে বলে জানিয়েছেন অধিকাংশ যাত্রী।
সিরাজগঞ্জ থেকে আসা যাত্রী মোহাম্মদ রাশেদ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নেমে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাড়ির পথ ধরেন। আগামী সোমবার (১ জুন) অফিসে যোগ দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন,
“শেষ দিনের অনাকাঙ্ক্ষিত ভিড় এড়াতে একদিন আগেই চলে এসেছি। যাওয়ার সময় যে তীব্র চাপ ছিল, এবার ফেরার পথে তেমন কিছুই মনে হয়নি। আগেভাগেই টিকিট কেটে রেখেছিলাম, তাই সপরিবারে বসেই আসতে পেরেছি।”
তবে স্বস্তির খবরের মধ্যেও ট্রেনের ভেতরে উপচেপড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন ট্রেনে নির্ধারিত আসনের বাইরেও অনেক যাত্রীকে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে দেখা গেছে। বিমানবন্দর স্টেশনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যাত্রী নেমে যাওয়ার পরও কমলাপুরে পৌঁছানো প্রায় প্রতিটি ট্রেনেই অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ছিল। অবশ্য ঈদের আগে ট্রেনের ছাদে চড়ে ভ্রমণের যে ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, ফিরতি যাত্রায় তেমন কোনো চিত্র চোখে পড়েনি।
কিশোরগঞ্জ থেকে ‘এগারোসিন্ধু’ ট্রেনে আসা যাত্রী নাসিমা আক্তার জানান, ট্রেনে ভিড় থাকলেও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল। দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ এলেও যাত্রা খুব একটা কষ্টকর মনে হয়নি। নিরাপদে ঢাকায় ফিরতে পারাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয়। একই সুর শোনা গেল জামালপুর থেকে ফেরা যাত্রী সোহেল মিয়ার কণ্ঠেও। তিনি জানান, ভোরে ট্রেনে উঠে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলেও যাত্রা ছিল বেশ স্বাভাবিক। ঈদের আগের সেই চেনা ধাক্কাধাক্কির তুলনায় এবারের পরিবেশ ছিল অনেক উন্নত।
দুপুরে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম থেকে আসা ট্রেনগুলোতেও যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। আসন পূর্ণ থাকার পরেও অনেককে দাঁড়িয়েই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে। তবে কিছু ভোগান্তি ছাড়া সিংহভাগ যাত্রীই স্বস্তির মধ্য দিয়ে তাদের যাত্রা শেষ করেছেন।
অবশ্য সব যাত্রীর অভিজ্ঞতা সমানভাবে সুখকর ছিল না। নোয়াখালী থেকে ফেরা এক নারী যাত্রী যাত্রাপথে তার গলার সোনার চেইন হারানোর অভিযোগ করেন। বিষয়টি জানার পরপরই রেলওয়ের নিরাপত্তাকর্মীরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলেও চেইনটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ঈদযাত্রার কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও এমন চুরির ঘটনা যাত্রীদের মনে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এর পাশাপাশি শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে কয়েকটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশ দেরিতে ছেড়ে আসায় গন্তব্যে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়েছে। বিশেষ করে নোয়াখালী, জামালপুর ও চট্টগ্রাম রুটের কিছু ট্রেন সঠিক সময়সূচি মেনে চলতে পারেনি। ফলে বেশ কিছু যাত্রীকে অতিরিক্ত সময় ট্রেনেই কাটানোর ভোগান্তি পোহাতে হয়।
তবে সামগ্রিক চিত্রে এবারের ফিরতি যাত্রাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সাধারণ যাত্রীরা। তাদের মতে, আগাম টিকিট বিক্রি, প্রশাসনের অতিরিক্ত নজরদারি এবং রেলওয়ের উন্নত ব্যবস্থাপনার কারণেই ঈদের আগের চরম ভোগান্তির পুনরাবৃত্তি ফেরার পথে আর ঘটেনি।
এদিকে স্টেশনে যখন একদিকে কর্মস্থলের টানে লাখো মানুষ রাজধানীতে ফিরছেন, ঠিক উল্টো চিত্রে অনেককে আবার ঢাকা ছেড়ে গ্রামের পথে যাত্রা করতেও দেখা গেছে। রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের পর যারা এখন বাড়ি ফিরছেন, তাদের বেশিরভাগই আগে থেকে টিকিট সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। ফলে ঈদ শেষ হলেও স্টেশন এলাকায় যাত্রীদের আনাগোনা ও চলাচল এখনও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেকটাই বেশি।